বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও আর্থিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে বেশকিছু জোরালো পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে পাকিস্তান। ক্ষমতায় এসেই গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১০ শতাংশ কমিয়েছিল পাকিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্রয়চুক্তি সংশোধন ও বাতিল, ট্যারিফ কাঠামো পরিবর্তন এবং শুল্ক কমানোর ফলে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট খরচ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কিলোওয়াট প্রতি ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ছিল ১০ রুপি ৭৯ পয়সা, যা ফেব্রুয়ারিতে কমে দাঁড়ায় কিলোওয়াট প্রতি ঘণ্টা ৭ রুপি ৫৭ পয়সা।
বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় ও আর্থিক চাপ কমাতে পাকিস্তান সরকার আরো কিছু বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এগুলোর লক্ষ্য বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম আরো কমিয়ে আনা। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শুল্ক কমানোর অংশ হিসেবে ‘টেক অ্যান্ড পে’ মডেলে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্তত ১৬টি কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি সংশোধন, বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের পরিবর্তে পাকিস্তানের মুদ্রা রুপিতে চুক্তি সংশোধন করা, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি অর্থাৎ রিটার্ন অব ইকুইটি ১৩ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ডলারের দাম ১৬৮ রুপিতে নির্ধারণ করে দেয়া।
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে ট্যারিফে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। বেশ কিছুদিন আগে বিভিন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের নেট মিটারিং ট্যারিফ চুক্তি ২৭ রুপি থেকে কমিয়ে ১০ রুপিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে দেশটির সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বিপুল হারে বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে সোলারের গ্রিড সিস্টেমে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করেছে।
বিদ্যুৎ খাতের অব্যাহত আর্থিক চাপ ও দায়দেনামুক্ত হতে পাকিস্তান সরকার বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে ১৬৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় সাশ্রয় হবে বলে প্রাক্কলন করেছে দেশটির সরকার। এ সিদ্ধান্তকে যুগান্তকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞরা।
এর আগে শাহবাজ শরিফের সরকার ক্ষমতায় এসে ভোক্তার ওপর আর্থিক চাপ কমাতে গ্রাহকের ১০ শতাংশ বিদ্যুতের দাম কমানোর ঘোষণা দেয়। মূলত মূল্যস্ফীতির চাপ জনগণের ওপর থেকে কমাতে বিদ্যুৎ খাতে নানা ধরনের সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে পাকিস্তান। রিজার্ভ ও আর্থিক সংকট মোকাবেলায় দেশটির সরকার নানা শর্তে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। এ সংস্কারে দেশটির রিজার্ভ ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন বিবেচনার শর্তে ছাড়ও দিয়েছে আইএমএফ।
পাকিস্তানের রিজার্ভ সংকট ও আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় বিদ্যুৎ খাতকে। যে কারণে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই বিদ্যুতের ক্রয়চুক্তি বাতিল, ট্যারিফ কাঠামো সংস্কার, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর আরোপিত শুল্ক সংস্কার এবং এ খাতে নতুন মডেল বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছিল।
পাকিস্তানের বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমানোর অংশ হিসেবে পাকিস্তানে বিগত এক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে গেছে। গত বছরের জানুয়ারির তুলনায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহার হ্রাস পেয়েছে। সেই হিসেবে দেশটির অর্থনৈতিক গতি-তৎপরতা কমে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিজুড়ে পাকিস্তানে বিদ্যুতের উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ৯৪৫ গিগাওয়াট/ঘণ্টা, যা গত বছরের জানুয়ারিতে ছিল ৭ হাজার ১৩০ গিগাওয়াট/ঘণ্টা। বার্ষিক হিসাবে ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা কমেছে দেশটিতে। ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল তা গত পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন। ২০২০ সালের মার্চে বিদ্যুতের উৎপাদন ছিল ৬ হাজার ৯১১ গিগাওয়াট/ঘণ্টা।
পরিবেশবান্ধব স্থানীয় জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর শুল্ক যাচাই ও সংস্কারে বড় উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। দেশটির আটটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর মূল কাঁচামাল হিসেবে আখের ছোবড়া ব্যবহার করা হয়। এসব কেন্দ্রের ওপর আরোপিত শুল্ক যাচাই ও সংস্কার করা হচ্ছে, যা বাস্তবায়ন করলে প্রতি বছর অন্তত ৮৮৩ কোটি রুপি সাশ্রয় করার প্রাক্কলন করেছে পাকিস্তান সরকার।
বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে ঠেকে যাওয়ায় গত কয়েক বছর উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করছে পাকিস্তান। আর তা করতে গিয়ে দেশটির বিদ্যুতের দাম অব্যাহতভাবে বাড়িয়ে যাচ্ছিল ইমরান খানের সরকার। একই সঙ্গে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয় বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন পাকিস্তানের বিশ্লেষকরা।
এক বছর আগে পাকিস্তানের বিদ্যুৎ খাত, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, রিজার্ভ পরিস্থিতি এবং বিদ্যুতের অব্যবহৃত সক্ষমতার পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো ছিল। বিদ্যুৎ খাতের নাজুক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে তাৎক্ষণিক কার্যকর সিদ্ধান্তের ফল পেতে শুরু করেছে দেশটির জনগণ। বিদ্যুতের দাম (ট্যারিফ) দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ে এখনো বেশি থাকলেও সামনের দিনগুলোয় এ ট্যারিফ যৌক্তিক পর্যায়ে কমে আসবে বলে আভাস দিয়েছেন দেশটির বিশেষজ্ঞরা।